অপরাজেয় কন্ঠ ডেস্ক : পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলেই অনেক শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় অভিযোগ- অনেকক্ষণ পড়েও কিছু মনে থাকে না। কেউ বলেন, পড়া বুঝতে পারেন না; আবার কেউ পড়ার টেবিলে বসেও মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। অথচ পড়াশোনাকে শুধু দীর্ঘ সময় বইয়ের সামনে বসে থাকার বিষয় হিসেবে না দেখে সঠিক কৌশল, পরিকল্পনা ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে পরিচালনা করলে কঠিন বিষয়ও সহজে আয়ত্ত করা সম্ভব।
শিক্ষাবিদদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মনোযোগ, পুনরাবৃত্তি, সম্পর্ক তৈরি, লিখে অনুশীলন এবং সময়মতো রিভিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আরও সহজ, আনন্দদায়ক ও কার্যকর করতে অনুসরণ করা যেতে পারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
১) আগ্রহ নিয়ে পড়ার টেবিলে বসুন;
পড়াশোনাকে কঠিন দায়িত্ব মনে করে শুরু করলে অনেক সময় মস্তিষ্কও চাপ অনুভব করে। বরং খেলা বা প্রিয় কোনো কাজ করার সময় যেমন আগ্রহ থাকে, পড়ার ক্ষেত্রেও তেমন ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করা জরুরি।
পড়তে বসার আগে ‘আমি পারব না’, ‘পড়াটা কঠিন’ কিংবা ‘কিছুই মনে থাকবে না’-এ ধরনের নেতিবাচক চিন্তা দূরে রাখা ভালো। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছুটা সতেজ অবস্থায় পড়াশোনা করলে অনেকের মনোযোগ তুলনামূলক ভালো থাকে।
২)বড় বিষয়কে ছোট অংশে ভাগ করুন
একসঙ্গে অনেক তথ্য মুখস্থ করার চেষ্টা করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই বড় তথ্যকে কয়েকটি ছোট অংশে ভাগ করে পড়া কার্যকর হতে পারে।
যেমন একটি ফোন নম্বর-
01820926917
একবারে মনে রাখার পরিবর্তে সেটিকে-
01820 926 917
এভাবে ভাগ করা যায়।
প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর না দেখে লিখে অনুশীলন করলে তথ্যটি দীর্ঘ সময় মনে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। একই পদ্ধতি বড় সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, সূত্র, তত্ত্ব কিংবা দীর্ঘ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়।
৩) মূল শব্দ বা ‘ক্লু’ খুঁজে বের করুন:
প্রতিটি বড় সংজ্ঞা বা সূত্রের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ থাকে। পুরো বাক্য মুখস্থ করার আগে সেই মূল শব্দগুলো চিহ্নিত করা গেলে বিষয়টি মনে রাখা সহজ হয়।
উদাহরণ হিসেবে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রে ‘ভরবেগের পরিবর্তন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এরপর এর সঙ্গে বলের সম্পর্ক এবং দিকের বিষয়টি যুক্ত হয়।
তাই নিজের নোটে সংক্ষেপে লেখা যেতে পারে—
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র: ভরবেগের পরিবর্তন- বলের সমানুপাতিক এবং বলের দিকেই।
এভাবে সূত্রের নাম দেখলেই মূল ধারণাটি মনে পড়ে যাবে। বই পড়ার সময় হাইলাইটার ব্যবহার করলে পুরো অনুচ্ছেদ রঙিন করার পরিবর্তে শুধু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা ক্লুগুলো চিহ্নিত করা ভালো।
৪)পড়ার সঙ্গে নিজের জীবনের সম্পর্ক তৈরি করুন:
মানুষ সাধারণত আবেগ, অভিজ্ঞতা ও বিশেষ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বিষয় সহজে মনে রাখতে পারে। তাই কোনো সূত্র বা তত্ত্বকে নিজের জীবনের বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সেটি আরও স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে।
যেমন পদার্থবিজ্ঞানের-
F = ma
সূত্রটি পড়ার সময় ভারী লাগেজ টানার অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। এখানে Force, Mass ও Acceleration- এই তিনটি বিষয় বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সূত্রটি শুধু মুখস্থ নয়, বোঝাও সহজ হয়।
প্রতিটি শিক্ষার্থী চাইলে নিজের জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা, তারিখ বা স্মৃতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ও তথ্য যুক্ত করে ব্যক্তিগত ‘মেমোরি ক্লু’ তৈরি করতে পারে।
৫) শুধু পড়া নয়, লিখেও অনুশীলন করুন:
চোখ বুলিয়ে বারবার পড়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে অনুশীলন অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে-
• গণিতের অঙ্ক
• জটিল সূত্র
• প্রমাণ
• গ্রাফ
• চিত্র
• গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব
এসব অবশ্যই লিখে চর্চা করা উচিত।
গণিতের ক্ষেত্রে সমাধান সামনে রেখে বারবার অঙ্ক করার পরিবর্তে প্রথমে নিজে চেষ্টা করা ভালো। আটকে গেলে সমাধান দেখে আবার বই বন্ধ করে নতুন করে করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। কারণ পরীক্ষার হলে পাশে কোনো সমাধান বই থাকবে না।
৬) নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে যান:
কোনো বিষয় সত্যিকার অর্থে বোঝার অন্যতম ভালো উপায় হলো সেটি অন্য কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করা।
বন্ধুর সঙ্গে পড়াশোনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে কারও কাছ থেকে সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া ভালো। তবে দীর্ঘ সময় ধরে শুধু অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজে নিজে ব্যাখ্যা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কল্পিত শিক্ষার্থী ধরে অথবা নিজের ভাষায় উচ্চস্বরে কোনো বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করলে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে তা সহজেই ধরা পড়ে।
৭) পড়ার পরিবেশকে পড়ার উপযোগী করুন:
মনোযোগ ধরে রাখার জন্য পড়ার জায়গা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেবিলে যে বিষয় পড়বেন, সম্ভব হলে শুধু সেই বিষয়সংক্রান্ত বই ও প্রয়োজনীয় উপকরণ রাখুন।
পড়ার জায়গা এমন হওয়া উচিত যেখানে-
• মানুষের চলাচল কম
• অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই
• টেলিভিশনের প্রলোভন নেই
• মোবাইল ফোন বারবার মনোযোগ নষ্ট করতে পারে না
বিশেষ করে পড়ার সময় মোবাইল ফোন নীরব করে দূরে রাখা কার্যকর হতে পারে। কারণ কয়েক মিনিট পরপর নোটিফিকেশন দেখার অভ্যাস পড়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে।
৮) রঙ, চিত্র ও ছন্দ ব্যবহার করুন:
অনেক তথ্য একসঙ্গে মনে রাখার জন্য ‘ভিজ্যুয়াল মেমোরি’ বা দৃশ্যভিত্তিক স্মৃতিশক্তি কাজে লাগানো যায়।
জটিল গ্রাফ, চিত্র বা শ্রেণিবিভাগ বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে লিখলে তা সহজে মনে থাকতে পারে। একইভাবে কয়েকটি বিষয়কে আলাদা গ্রুপে ভাগ করে রঙিন নোট তৈরি করা যেতে পারে।
কঠিন তালিকার প্রথম অক্ষর দিয়ে নতুন শব্দ, বাক্য বা ছন্দ তৈরি করাও একটি জনপ্রিয় স্মরণকৌশল। নিজের তৈরি মজার শব্দ অনেক সময় বইয়ের দীর্ঘ তালিকার চেয়ে বেশি মনে থাকে।
৯) সফল পড়াশোনার মূল চাবিকাঠি- রিভিশন:
একবার পড়লেই সব তথ্য দীর্ঘদিন মনে থাকবে এমনটি সাধারণত হয় না। শেখার পর নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনরাবৃত্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর রুটিন হতে পারে-
আজ পড়ুন → অল্প সময় পর মনে মনে ঝালিয়ে নিন → পরদিন আবার দেখুন → কয়েক দিন পর পুনরাবৃত্তি করুন → এক সপ্তাহ পর আবার রিভিশন দিন।
পড়ার বিরতিতেও কয়েক মিনিট আগে পড়া বিষয়টি মনে করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, সংজ্ঞা, ক্লু ও সারাংশ আলাদা খাতায় লিখে রাখলে যাতায়াতের সময়ও দ্রুত রিভিশন দেওয়া সম্ভব।
১০) বইয়ের শেষে তৈরি করুন ব্যক্তিগত ‘সামারি পেজ’:
বইয়ের শেষের ফাঁকা পাতাগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য।
যে বিষয়গুলো:
• সহজে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে
• পরীক্ষার আগে দ্রুত দেখতে হবে
• গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বা সংজ্ঞা
• নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা থেকে পড়তে হবে
সেগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা পৃষ্ঠা নম্বরসহ বইয়ের শেষের পাতায় লিখে রাখা যেতে পারে.তাহলে পরীক্ষার আগে কয়েক ঘণ্টা সময় পেলেও পুরো বই উল্টাতে হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দ্রুত খুঁজে পাওয়া যাবে।
১১) ক্লাস থেকেই শেখার কাজ শুরু করুন:
ভালো ফলের প্রস্তুতি শুধু পরীক্ষার আগে শুরু করলে চাপ বেড়ে যায়। ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষককে অনুসরণ করলে পড়ার বড় একটি অংশ সেখানেই আয়ত্ত করা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের উচিত:
• ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া
• প্রয়োজনীয় নোট নেওয়া
• প্রশ্ন করা
• নিয়মিত অ্যাসাইনমেন্ট করা
• বাসায় ফিরে সেদিনের পাঠ আবার দেখা
প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার অভ্যাস তৈরি হলে পরীক্ষার আগে বিশাল সিলেবাস পাহাড়ের মতো মনে হবে না।
১২) ভালো পড়ুয়াদের সঙ্গে সময় কাটান:
বন্ধু মানুষের চিন্তা ও অভ্যাসে বড় প্রভাব ফেলে। যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে, সময়ের মূল্য বোঝে এবং লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যায়- তাদের সঙ্গে চলাফেরা করলে নিজের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে সারাক্ষণ আড্ডা, বিনোদন ও সময় নষ্ট করার পরিবেশে থাকলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
তাই অন্তত কয়েকজন দায়িত্বশীল ও মনোযোগী শিক্ষার্থীর সঙ্গে নিয়মিত পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করা ভালো।
১৩) প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি করুন মজার স্মরণকৌশল : দীর্ঘ তালিকা মনে রাখার সবচেয়ে মজার উপায়গুলোর একটি হলো প্রতিটি বিষয়ের প্রথম অক্ষর নিয়ে একটি নতুন শব্দ বা বাক্য তৈরি করা।
বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন ভাগ মনে রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করা যায়। যেমন প্রজাতন্ত্র, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন অংশের প্রথম অক্ষর নিয়ে নিজের মতো করে একটি মজার বাক্য তৈরি করা যেতে পারে।
অদ্ভুত বা হাস্যকর বাক্য হলেও সমস্যা নেই। বরং যত মজার হবে, মনে থাকার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
পড়াশোনার আসল রহস্য
ভালো ফলের জন্য শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন-
মনোযোগ + বোঝার চেষ্টা + ছোট অংশে ভাগ করা + লিখে অনুশীলন + নিয়মিত রিভিশন।
পড়াশোনাকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে যদি একজন শিক্ষার্থী নিজের জন্য সঠিক কৌশল তৈরি করতে পারে, তাহলে কঠিন অধ্যায়ও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠবে।
সব শিক্ষার্থীর শেখার ধরন এক নয়। তাই কারও জন্য লিখে পড়া বেশি কার্যকর হতে পারে, কারও জন্য ছবি ও চার্ট, আবার কারও জন্য আলোচনা বা বারবার অনুশীলন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিজের জন্য কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে, তা খুঁজে বের করা।
লেখক, প্রভাষক, প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক…
মনে রাখুন- ভালো পড়াশোনা মানে শুধু বেশি সময় পড়া নয়; সঠিক পদ্ধতিতে পড়া, বুঝে শেখা এবং সময়মতো বারবার রিভিশন দেওয়া।
Leave a Reply