পড়াশোনাকে আমরা অনেকেই পাহাড়সম চাপ মনে করি। অথচ কৌশলটা জানা থাকলে এই ভয় কাটানো এক চিমটির ব্যাপার! দিন-রাত বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকাই কিন্তু জিনিয়াস হওয়ার লক্ষণ নয়। দরকার বুদ্ধিমানদের মতো ‘স্মার্ট ওয়ার্ক’। বিজ্ঞানের আলোকে সাজানো কিছু কৌশল মানলেই পড়ার টেবিল হয়ে উঠবে আনন্দের জায়গা, আর স্মৃতিশক্তি হবে দুর্দান্ত প্রখর।
১. পড়ার টেবিলে জাদুর ছোঁয়া: শুরুটা হোক পরিকল্পনা দিয়ে:
টার্গেট লক করুন: হুট করে বই খুলে না বসে আগে মাথায় ছক কেটে নিন- ঠিক কী পড়বেন, কেন পড়বেন এবং কতটুকু শেষ করবেন। প্রতিদিনের ছোট ছোট গোল সেট করুন। বৈচিত্র্যময় বিষয় বেছে নিলে একঘেয়েমি ধারেকাছেও ঘেঁষবে না।
সকালের সেরা এনার্জি রিচার্জ: দিনের প্রথম ভাগে ব্রেইনের ব্যাটারি থাকে ফুল চার্জ! তাই জটিল, খটমটে কিংবা বোরিং পড়াগুলো সকালে সেরে ফেলুন। সহজ ও পছন্দের পড়াগুলো বিকেলে বা রাতের জন্য তুলে রাখুন।
পমোডোরা বা ব্রেক টেকনিক:মানুষের মস্তিষ্ক কিন্তু ২৫ মিনিটের বেশি টানা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই প্রতি ৫০ মিনিট পড়ার পর নিজেকে ৫ মিনিটের একটা রিফ্রেশিং ব্রেক দিন। তবে সাবধান! ব্রেকে কোনোভাবেই ফেসবুক, রিলস বা গেমিঙে ডুবে যাওয়া যাবে না।
স্মার্ট বসার ভঙ্গি: কুঁজো হয়ে নয়, সোজা হয়ে বসুন। চেয়ারে এমনভাবে বসুন যেন পা শক্তভাবে মেঝেতে থাকে এবং চোখ থেকে বইয়ের দূরত্ব অন্তত দুই ফুট হয়। সঠিক ভঙ্গি শরীরকে সতেজ রাখে।
মাইন্ড ডাইভারশন বন্ধের কৌশল: পড়ার মাঝে মাথার ভেতর রাজ্যের চিন্তা ভিড় করলে সেগুলো ঝটপট একটা খাতায় লিখে ফেলুন, এতে মাথা হালকা হবে। আর মন উড়ুউড়ু করলে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, ঘরের ভেতরেই অল্প হেঁটে মনোযোগ আবার ফিরিয়ে আনুন।
নিজেকে ছোট উপহার:দিন শেষে টার্গেট পূরণ হলে নিজেকে একটা আইসক্রিম বা পছন্দের গান উপহার দিন। এতে ব্রেইন পরবর্তীতে আরও বেশি মনোযোগ দিতে উৎসাহিত হয়।
ব্রেইনের সুপার-পাওয়ার: যেভাবে যত্ন নেবেন স্মৃতিশক্তির:
পজিটিভ মাইন্ডসেট: মন আর মস্তিষ্কের যোগাযোগ অত্যন্ত গভীর। নেতিবাচক চিন্তা বা সন্দেহ করার মানসিকতা নিউরনগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করে। সবসময় পজিটিভ ভাবুন, নিজেকে সৃজনশীলাজে ডুবিয়ে রাখুন।
রাগ নিয়ন্ত্রণ: প্রচণ্ড রাগ ব্রেইনের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, কারণ রাগের মাথায় শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। তাই রাগকে না বলুন।
মেডিটেশনের ম্যাজিক: নিয়মিত মেডিটেশন ও ইয়োগা মস্তিষ্কের ডাটা ধারণ করার ক্ষমতা দ্বিগুণ করে দেয়। সুযোগ থাকলে খোলা হাওয়ায় হাঁটুন।
পর্যাপ্ত ঘুম:ক্লান্ত ব্রেইন কখনোই ভালো পারফর্ম করতে পারে না। প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা নিবিড় ঘুম ব্রেইনের রিচার্জের জন্য জরুরি।
পড়া চিরতরে মাথায় গেঁথে নেওয়ার বৈজ্ঞানিক ট্রিকস:
অদম্য আত্মবিশ্বাস: “আমি পারব”-এই মাইন্ডসেট অর্ধেক কাজ সহজ করে দেয়। বিশেষ করে ভোরের শান্ত আবহাওয়ায় পড়ার অভ্যাস গড়ে তুললে জটিল বিষয়ও সহজে আয়ত্ত হয়।
কনসেপ্ট ট্রির ম্যাজিক: একটি বড় অধ্যায়কে ৭টি অংশে ভাগ করুন। প্রতিটা ভাগের মূল কথা এক লাইনে লিখে খাতায় আঁকা একটি গাছের পাতায় সাজিয়ে নিন। প্রতিদিন গাছে চোখ বোলালেই পুরো অধ্যায়ের ম্যাপ মাথায় সেভ হয়ে যাবে!
রাইমিং বা ছন্দ কৌশল: শক্ত তথ্য মনে রাখতে ছন্দের আশ্রয় নিন। যেমন রংধনুর রং ‘বেনীআসহকলা’ কিংবা ত্রিকোণমিতির ‘সাগরে লবণ আছে’। ছন্দ দিয়ে পড়া কখনোই মন থেকে মোছে না।
টাইমলাইন বা কালরেখা পদ্ধতি: ইতিহাসের শত বছরের সাল-তারিখ মনে রাখতে টাইমলাইন বানিয়ে নিন। পর পর সাল ও বিখ্যাত মানুষদের নাম লিখে চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখলে পড়াটা জলের মতো সহজ মনে হবে।
শব্দ করে পড়া ও লেখার পাওয়ার: পড়ার সময় উচ্চস্বরে বললে সেই শব্দ কানে বাড়ি খেয়ে সোজা মস্তিষ্কে মেমোরি হিসেবে জমা হয়। আর পড়ার সাথে সাথে খাতায় লেখার অভ্যাস করলে তা সরাসরি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে রূপ নেয়।
মাইন্ড ম্যাপিং ও কেন-র খোঁজ:যা পড়ছেন, তার মনের ভেতর একটা রঙিন ছবি এঁকে ফেলুন। গল্প বা বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে চারপাশের চেনা বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে নিন। কোনো কিছু অন্ধের মতো না মেনে প্রশ্ন করুন-“কেন হলো?” উত্তর খুঁজতে গেলেই পড়া স্থায়ী হয়ে যাবে।
পড়া শেয়ারিং ও মুখস্থবিদ্যাকে গুডবাই: কোনো অধ্যায় শেখার পর বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তা গল্পের মতো আলোচনা করুন। অন্যের সাথে শেয়ার করলে পড়া আরও ঝালিয়ে নেওয়া হয়। অন্ধের মতো মুখস্থ না করে বিষয়টির মূলভাব বুঝুন, তবেই যেকোনো উত্তর নিজের ভাষায় বানিয়ে লিখে বাজিমাত করতে পারবেন।
এ,এস,এম, রেজাউল করিম(পারভেজ)
লেখক, প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, প্রভাষক…
Leave a Reply